“একাকী গায়কের নহে তো গান”

সারাদিনের নানান শব্দের মধ্যে দিয়ে একটু একটু করে সুর চুঁইয়ে পড়ে মনের কুয়োতলায়।সেই সুরে পা পিছলে সোজা স্মৃতির শিকড়ে এসে পড়ি।সেথায় হৃদয়ের বাস।’গানের হৃদয়’।জয় গোস্বামীর এই বই-এ তার হদিস খুঁজলেন সুপ্রিয় মিত্র

 

হিন্দিভাষায় একটা চলতি শব্দবন্ধ আছে – ‘ ল্যগন্ কি বাত ‘… ঠিক কোন মুহূর্তে একটা জীবনকে কোনও একটা পার্থিব বা অপার্থিব বস্তু ধরা দেবে এবং ঘনিষ্ঠতা তৈরি হবে, কেউই বলতে পারে না। শুধু তার অপেক্ষায় থাকা যেতে পারে মাত্র। সমানভাবে বলা যায় – ‘ When the student is ready, the teacher comes… ‘ এও সেই ‘ল্যগন কি বাত’।
বইয়ের ক্ষেত্রেও মনে হয় এই একই। আমায় অরণি দা একবার বলেছিলেন – ‘ তুমি যে বইকে খুঁজছ, সেই বইও তোমাকে খুঁজছে ‘… এই কথার ভেতর যে রহস্য, তা পাঁচফোড়ন হলুদ লঙ্কা জিরে মশলার মতন শুক্তোতে এমনভাবে মিশে গেছে যে আলাদা ক’রে খুঁজে পাওয়া যায় না, তবু বুঝতে পারা যায় এরা আছে।
বইয়ের পাঠ ও তার আফটার এফেক্ট, মানে, শেষ পর্যন্ত কী নিয়ে আমি পরের বইয়ে এগিয়ে গেলাম, তাকে বাদ দেওয়া অমূলক।
জয় গোস্বামীর লেখা এই বই বলতে গেলে আমার হাতে ধরা দিয়েছিল।


দুর্ঘটনায় বন্ধুর মৃত্যুর ঘাটকাজের আগেরদিন বাড়ি যাব। মেস থেকে বেরনোর সময় কী বই নেওয়া যায়, সারা রাস্তা কাটানোর জন্য এই নিয়ে বিভ্রান্ত হচ্ছি। বইয়ের পিরামিড ডাঁইই থেকে তুলতে গেলাম অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘ নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণা ‘ ; আর, তাক থেকে লাফ মারল এই বই। ব্যস। অলৌকিক হাতকে বললাম – যথা আজ্ঞা!
হাওড়া স্টেশন ছাড়ল যখন ট্রেন, বই বেরিয়ে এল ব্যাগ থেকে। ট্রেনের হাওয়া আর আমার স্বভাবে কিছু মিল আছে। যে কোনও বই পড়ার শুরুতে আমার বইয়ের মাঝখানের অঞ্চলে কয়েকটা পাতা প্রথমে পড়বার অসুস্থতা আছে। ট্রেনের ঘুপঘুপ হাওয়া তাকে আরও আস্কারা দেয় বইয়ের পাতা হুড়মুড় ক’রে পালটে দিয়ে।

XyEetaLYM9STRTeSRCFWUXr4
শিল্পী: অর্ণব ভৌমিক

গদ্যের নাম – শৈশব। গোঁসাই শুরু করেছেন – ‘ শৈশব হল সেরকম একটা গানের মতো, যেটা আমারই শুধু মনে পড়ছে।’ প্রথম লাইনই খুন হবার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা ব’লে তো একটা কথা আছে। গোঁসাই লিখে চলেছেন তাঁর বাবার মুখে শোনা গান। তাঁর মামামণির গলায় ভেসে আসা গান, যা কুড়ি বছর পর এক কিশোরের গলায় শুনে ওনার শৈশবে ফিরে যাওয়া, অস্থির হওয়া, গানকে ঘিরে আরও কিছু স্মৃতি নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। সাথে আমাকেও। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে ‘বোরোলীন ‘ এর অ্যাড জিঙ্গেল। ‘ সুরভিত অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রীম, বোরোলীন। বোরোলীন ত্বক, সুস্থ ত্বক ‘। এই সমগ্র কথায় যে সুর মাখানো আছে, তা আমরা নাইন্টিজের খোকাখুকু স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। আর ভেসে উঠছে টিভির পর্দা, রেডিওর নব, মাঠের একধারে ছড়ে যাওয়া হাঁটু, প্রিয় বন্ধুর হাতের যন্ত্রণায় অ্যান্টিসেপ্টিক থুতু, মায়ের আদর, দিদার চোখ ভিজে যাওয়া ওইটুকু কেটে যাওয়া দেখেই। আমাদের শৈশবের স্মৃতিতেও এই সুর মলমের মতন ভেসে বেড়াচ্ছে। কেমন যেন সব গুলিয়ে যাচ্ছে, তাই না। গদ্যের শেষদিকে গোঁসাই লিখছেন – এভাবেই শৈশব আমাদের থেকে নেয়, সব গুলিয়ে দেওয়ার প্রতিশোধ।
হয়তো কিছুই নয়, তবু অনেক কিছু আমরা ভেবেও ফেলতে পারি। একটা গানই যথেষ্ট।
আমরা জানি, এরকম কতবার হয়েছে, কোনও একটা দিন বা ঘটনা আমাদের মনেই ছিল না। হেঁটে যেতে যেতে, বা বাসের ভেতর হঠাৎ একটা গান বেজে উঠল, আর তার পূর্বশ্রুতিকে অবলম্বন ক’রে ফিরে এল সেইসব ঘটনা বা দিন। গান নিজেই যেন মেমোরী কার্ড।
‘একলা থাকার রবীন্দ্রনাথ ‘ শীর্ষক গদ্যে গোঁসাই লিখছেন তাঁর একাকী সময়ে রবিঠাকুরকে শোনার দোলাচল স্মৃতিস্তম্ভ নিয়ে। ঢুকে পড়ছে নিজস্ব লেখালিখির কথা। ঢুকে পড়ছেন জীবনানন্দ। আরেকটা গদ্য মনে পড়ছে – ‘ যে কথা গানের অধিক ‘। উস্তাদ আলি আকবর খাঁ সাহেবের এক একটা কথা। কুড়ি তিরিশ বছর পেরিয়ে কীভাবে একটাই রাগ নিজের ভাবনার কাছে পালটে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে স্বরের চলন, তার গতি। দ্রুতলয়ের ভেতর, তবলার চামড়ায় চাপড়ের ভেতরে, এত পরিচ্ছন্ন অথচ শব্দস্রোতের ভেতর দেখা যাচ্ছে খাঁ সাহেব চোখ বুজে একাকী হয়ে আছেন সুরের সমুদ্রে। এ আমার তাৎক্ষণিক ভাবনা। ওনার চোখের ভেতর কী চলছে, তাকে ছুঁতে পারাও স্বপ্নাতীত। কিংবা ওই দেখতেই পাচ্ছি। ওটুকুই সম্বল।

collage 2
শিল্পী: সিদ্ধার্থ দে । ডানদিকে: মূল বইয়ের প্রচ্ছদ

গোঁসাইয়ের স্মৃতি থেকে বেরিয়ে আসছে এমনকিছু কথা, যেখানে লেখার ‘জলজ দর্পণে’ দেখা যাচ্ছে কিছু মানুষকেও। তাঁদেরর যেন কাছ থেকেই চেনা যাচ্ছে, অনেকটা না হলেও কিছুটা তো বটেই। প্রয়াত চিত্র-পরিচালক মণি কাউলের কথা যেমন। মণি কাউল দীর্ঘকাল ধ্রুপদ শিখেছিলেন জিয়ামহিউদ্দিন ভাগরের কাছে। কোনও এক দিন তালিমের সময় অনেকক্ষণ মণি কাউল গাইছেন, তাঁর গুরু অথচ কিছুই বলছেন না। কিছু ভুল হল কিনা জিজ্ঞেস করতে, উস্তাদ ভাগর বলছেন, এই ভুলগুলো নিয়েই তো তুমি। তোমার ভুলগুলো আমি শুনছি – দেখছি। ভুলের মধ্যে দিয়েই তো একজন মানুষকে চেনা যায়। আর সঙ্গীতের কাজই তো তাই, একজন মানুষ নিজেকে আরও নিজের ভেতর খুঁজে পাবে, ভুলের মধ্যে দিয়ে। ঠিক একই কথা প্রায়, খাঁ সাহেব বলছেন। ‘ সব রিপুগুলোই খানিকটা দরকার… কোন রিপুকে কতটা কাজে লাগাবে এটা তোমার ওপর।’ পড়তে গিয়ে মনে হল, এই ‘ তোমার ওপর ‘ বাক্যবন্ধ নির্দেশ করছে প্রত্যেকটা মানুষকে তাদের মনের তফাতে ও বৈশিষ্ট্যে।
এই বইয়ে একটি বিশেষ গদ্য হল ‘ ও মধুর ‘। সেকালের গান ও তাদের গায়ক গায়িকা বলতে আমরা যাঁদের বুঝি, যেমন – নচিকেতা ঘোষ, কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়, দিলীপকুমার রায়, গোবিন্দগোপাল, উমা বসু প্রমুখের কথা এখানে তুলে ধরেছেন। পড়তে ভালো লাগছে, তাঁদের জানা যাচ্ছে। যাঁরা কখনও তাঁদের গান শোনেননি, এই গদ্য পড়ার আগ্রহ জন্মাবে এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু কোথাও গিয়ে এই গদ্য হয়ে উঠেছে তথ্যবহুল। তথ্য ততক্ষণ ভালোলাগে, যতক্ষণ তাতে সময়ের ও পারিপার্শ্বের ঈঙ্গিত থাকে। কোথাও গিয়ে মনে হয়েছে সময় যেন এই গদ্যের ভেতর পিছলে যাচ্ছে। মানেটা এরকম – বহুদিন হল হানি সিং মারা গিয়েছেন। এই বক্তব্যে আমরা জানতেও পারিনা, আজ কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, কবেই বা হানি সিং নামের এক লোক মারা গেলেন।
যাই হোক,গানের ভেতর দিয়ে যদি তাকে আমরা বড় জোর আন্দাজ করতে পারি, নিশ্চয়তা পাইনা। একইভাবে প্রসঙ্গ ঘুরে যায় এই অক্ষমতা কে কেন্দ্র করে। সুরের ভাষা হাসির চেয়েও উন্নতমানের। আমি দেখেছি নিরক্ষর মাছওয়ালা বলিউড টলিউড সমস্ত গানই শুনছেন তাঁর চায়না ফোনে, কিন্তু ফোন আসতেই বেজে উঠছে মোৎজার্টের মল্টো আলেগ্রো সিম্ফোনি নাম্বার ৪০, বিখ্যাত কানজোড়ানো সুর – তারারাম তারারাম তারারাম তাম, তারারাম তারারাম তারারা… ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করতে বললেন – ‘অত বুঝিনা বাবু, তবে বেশ অন্যরকম!’
এরপর আর কিছু বলবার তেমন থাকে না।

 

25627066_1531218836956143_551121683677855720_o
চিত্রগ্রাহক: কৌশিক চন্দ্র

এই হল গানের হৃদয়। সে কাকে ছুঁয়ে যায় কিভাবে, এই রহস্য নিয়েই একজন সুরকার বা গায়ক বা শ্রোতা কাটিয়ে দেন। আমরা তো দেখেছি, একই গান দুইজনের গলায় দুইরকম শুনতে লাগছে। একই ক্রমে স্বর যাচ্ছে, একই সাইলেন্স, একই ঠেকা, একই আবহ নির্মাণ, তবু কোথায় গিয়ে যেন আলাদা করে দিচ্ছে দুজনকে। আবার এও দেখা যায়, একই গান একইজন আজ যেমন গাইলেন, সাতদিন পরে গাইতে গিয়ে শোনা গেল আগেরমতো আর নেই। এই মুহূর্ত, মুহূর্তে তৈরি আর মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অলৌকিকতা আমাদের নাকাল করে রাখে। আর সেখানেই যেন মনে হয়, গান একেকদিন একেকরকমভাবে ধরা দিচ্ছে। এই কথাই বহুবার গোঁসাইয়ের লেখায় লেখায় ফিরে আসছে।
কিন্তু দিক ভোলাবার পাগল বা আমার আপন গান বা নেশা – শীর্ষক গদ্য পড়তে গিয়ে, কোথাও মনে হচ্ছে, কিছু পরিস্থিতি যেন গোঁসাই নিজেরই মনে মনে বানানো। নিজেরই কল্পনার জগত, অথচ সত্য ব’লে উপস্থাপিত করা। নন-ফিকশন কথার ভেতর ফিকশনের চাটনি ঢুকে গদ্যকে মাত্রাছাড়া তৃপ্তি দেওয়ার চেষ্টা। এই দ্বিধা বা নাক সিঁটকানো যদিও আমার ব্যক্তিগত। কৃত্তিবাস পত্রিকার প্রথম নব পর্যায়ের, যখন তিন মাস ছাড়া প্রকাশিত হত, সেই সময়ে সাক্ষাতকার সংখ্যা হয়েছিল। তাতে, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাতকার নিয়েছিলেন গোঁসাই। সন্দীপনের একটি গল্প নিয়ে গোঁসাই বলতে শুরু করেছিলেন। কিছুক্ষণ পরে, সন্দীপন তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, যা অনেকটা এরকম – জয়, এ তোমার ভাবা গল্প। এ আর আমার লেখা গল্প নয়।
খানিকটা তেমনই। কোথায় পড়তে গিয়ে গোঁসাইকে মনে হয়েছে, উনি যে খুব ভালো গান বোঝেন, তা উনি সত্যিই বুঝিয়ে দিতে চাইছেন।
তবু… তবু, এই সমস্ত ব্যতিরেকে শুধু ‘শৈশব’, ‘যে কথা গানের অধিক’ এবং ‘গানের হৃদয়’ শীর্ষক গদ্য তিনটের জন্য এই বই না পড়লে অনেক অনুধাবন বাকি থেকে যায়। এই অনুধাবন নিজের, নিজস্ব আত্মার বলাই বাহুল্য।
‘শৈশব’-এ গোঁসাই লিখছেন, ‘শৈশব অনেক ভুল জিনিসও মনের মধ্যে বসিয়ে দেয়।’ স্মৃতির ওপর স্মৃতির স্তরে এক একজনকে আলাদা করা যায় না অনেকসময়। সমাপতিত হয়। সেঁটে যায়। তুলতে গেলে ছিন্ন ছিন্ন অংশ একে অপরের গায়ে লেগে থাকে। গান যেন অনেকখানি সেই আঠা।

IMG_20180221_0002
শিল্পী: তৃণময় দাস

বই পড়তে পড়তে, আমি ফিরে গেছি আমার ছোটবেলাকার গানে। বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে মায়ের ঘুমপাড়ানি গান, ঠাকুমার গলায় সাঁওতালি গান, ক্ষেত থেকে বাড়ির খামারে ধান উঠে এলে ধান ঝাড়ার গান, নবান্নের দিনে গান, স্কুলে আমাদের বেঞ্চ বাজানো গান, প্রথম প্রেমের পহেলা ন্যশা, হেমন্ত মুখুজ্যের গলা ক’রে গাওয়া প্যারোডি। বহুকিছু মনে পড়ে যাচ্ছে। শুদ্ধ স্মৃতির ভেতর কখনও ঢুকে পড়ছে বেনোজল। প্রকৃতির নিয়মেই।
এই এতকিছু মনে পড়া এবং একইসাথে নতুন দিনের নতুন কৌতূহলের আভাস, এই বই আমায় দিয়ে গেল। গানের নিজস্ব মন, নিজস্ব স্মৃতিশক্তি ও হৃদয়ের ভেতর দিয়ে আমরা বারবার হাঁটতে হাঁটতে, চুপচাপ বসে থাকতে থাকতে ঢুকে পড়ি এমনসব গলির ভেতর, যা অলৌকিক হয়ে ওঠে।
আর, সমস্ত ঘটে যাওয়ার ভেতর স্বাদহিসেবের নুনের মতো অলৌকিকতার ছিটে যদি ভেবে নেওয়া যায়, তবে জীবনকে সহজ ভাবতে তেমন অসুবিধে হয়না। গান সেখানে অণুঘটকের কাজ করে।
গোঁসাইয়ের এই বই আমার স্মৃতির সুটকেসে থেকে যাবে বহুদিন। সুটকেস সাথে, বহু জায়গায় ঘুরতে ফিরতে এই বইয়ের কথা আমার মনে পড়ে যাবে কারণে কিংবা কোনও কারণ ছাড়াই।

 

শীর্ষ চিত্রের শিল্পী: সায়ন্তি মুখার্জী
পরবর্তী পোস্ট: ১লা মার্চ

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Powered by WordPress.com.

Up ↑

%d bloggers like this: