বাংলায় আত্মজীবনীর অভাব নেই, সে সেই সুপ্রাচীন রাসসুন্দরী দাসীর লেখা “আমার জীবন” থেকে নিতান্ত অর্বাচীন “রূপম: অন দ্য রকস্” অবধি আত্মজীবনীর প্রাচুর্য্য ও বিভিন্নতা কিছু কম নয় । তপন রায়চৌধুরীর “বাঙালনামা” পড়লে যেরকম মোটেই মনে হয়না যে কোনও পন্ডিত, কৃতবিদ্য ইতিহাসকারের লেখা, তেমনই মনোজ মিত্রের “যখন যা মনে পড়ে” যদি পড়েন, তবে আপনি সেখানে মোটেও এক প্রথিতযশা অভিনেতাকে পাবেননা । আত্মজীবনীর সুর বড় আত্মিকতার তারে বাঁধা- সেখানে যদি লেখকের স্ব-বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে তাহলে পাঠক তাঁর জীবনের গল্প েহারিয়ে যায় কি করে? “জীবনস্মৃতি” আমরা রবীন্দ্রস্মৃতি উদ্ধারের জন্য শুরু করলেও পরে কিন্তু তা কোথাও পাঠকের কাছে নিতান্তই একটি মানুষের জীবনখাতার কেজো হিসাব-নিকাশ হয়ে দাঁড়ায় ।

অবভাস থেকে প্রকাশিত মনীন্দ্র গুপ্তের “অক্ষয় মালবেরী” হয়ত লেখকের কাছে নিছক আত্মজীবনী, কিন্তু পড়তে গিয়ে কোথাও পরতে পরতে “পথের পাঁচালী” র অপুর কথা মনে করিয়ে দেয় । লেখক নিজেই বলছেন যে তিন খন্ডে সমাপ্য “অক্ষয় মালবেরী” তিনি লিখতে শুরু করেন ১৯৮১ সালে যখন তিনি বীরভূমের তিলপাড়া ব্যারেজে ইঞ্জিনীয়ার রূপে কর্মরত । পরে বিভিন্ন পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে বেরোনর পর ২০০৯ সালে অবভাস অখন্ড সংস্করণটি, যেটি আমি পড়েছি, সেইটি প্রকাশ করে ।

“অক্ষয় মালবেরী” র জাদু লুকিয়ে আছে প্রাক-স্বাধীনতা গ্রাম বাংলা ও বাঙালীর ক্রমশ পরিবর্তিত সমাজজীবনের সুস্বাদু পট অঙ্কনে ।বইটিতে লেখকের জন্ম থেকে তাঁর কোলকাতায় এসে প্রায় ২২ বছর বয়স অবধি জীবনকাহিনী বর্ণিত । গ্রামবাংলার বহু হারিয়ে যাওয়া অতীত সংস্কৃতি যেমন ভাদ্র-সংক্রান্তিতে নদীতে বাইচ খেলা, নবান্ন উৎসবে নতুন চালবাটা দিয়ে বানানো নবান্ন পান করা, দূর্গাপুজোর ভাসান, শৈশবে হাতে-খড়ি- পড়তে পড়তে আপনার চার কামরার ফ্ল্যাট হয়তো পুব-দক্ষিণ খোলা বারদুয়ারী বিশাল বসতবাটি হয়ে যাবে । যেখানে দিনের শেষে দাওয়ায় বসে চিড়ে-নারকোল কোরা খেতে বসলে নারকেলপাতার ফাঁক দিয়ে নেমে আসা চাঁদের আলো নারকোল কোরায় মাখা হয়ে যায় ।

গ্রামের কুসংস্কার, সহজ ভয়-ভীতি সেগুলোও উঠে এসেছে লেখকের কলমে । সন্ধ্যা নামলেই গ্রাম্যমনে কেমন অতিপ্রাকৃত শক্তিদের, অপদেবতাদের দাপট বাড়ে তা খুব যত্ন করে লেখক দেখিয়েছেন । বিশ্বাস-অবিশ্বাস বড় কথা নয়, লেখকের ব্যবহৃত ম্যাজিক রিয়্যালিজম বা জাদু বাস্তবতা পাঠককে আঠার মত লেপ্টে রাখে বইয়ের পাতায় ।

তবে মনীন্দ্র গুপ্তের লেখার সবচেয়ে বড় গুণ তাঁর লেখার বিষয়বস্তু নয়, বরং তাঁর ভাষা ও গদ্যশৈলী । এরকম গদ্যের আস্বাদ অবচেতনে লেগে থাকে কমলকুমার মজুমদার পড়লে । বইটির একটি অংশের নাম “অ্যাডভেঞ্চার: শরতে” (পৃষ্ঠা ৭০), সেখানে লেখক লিখছেন, “ভোরে ঘুম ভাঙলে দেখি মনের কোথ্থাও ভয়ের লেশমাত্র নেই । পৃথিবী যেন সাবানের বুদবুদ ।“ আর একটি অংশের নাম, “তার পর”, (পৃষ্ঠা ৭৫) এখানে লেখক লিখছেন, “লক্ষীছাড়া বাড়িতে এখন কেবল খিদে পায়, কিন্তু সময়মতো খেতে পাইনা । একা স্নান করি, তেল মাখতে ইচ্ছে করে না । সন্ধ্যায় পা ধুই না, সকালে রাত্রে পড়তেও বসি না । অফুরন্ত স্বাধীনতা, কিন্তু বড় কষ্টে যেন দিন কাটছে ।“

প্রথম উদাহরণে লেখক যে simile ব্যবহার করছেন, অন্ধকার কেটে গেলে পৃথিবী যে সাবানের বুদবুদ হয়ে ওঠে এরকম অজস্র simile পরতে পরতে ঢেকে রেখেছে “অক্ষয় মালবেরী” কে । দ্বিতীয় উদাহরণে লেখকের ভাষাশৈলীর ব্যবহার লক্ষণীয় । Epiphany ব্যবহার আছে শৈশবের সুক্ষ্ম অনুভূতি গুলো বোঝার জন্য । নৈসর্গ বর্ণনার সময় লেখকের কলম বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা বহুলাংশে অনুপ্রাণিত বলে মনে হতেই পারে । আর মানুষের মানসিক দৃষ্টিকোণ বোঝার জন্য লেখক হয়ে উঠেছেন কমলকুমার মজুমদারের মত metaphysical ।

পরিশেষে বলি, “অক্ষয় মালবেরী” অনেকটা তারাপদ রায়ের লেখা তাঁর পুব বাংলার জীবনের বৃত্তান্তের মত । প্রবহমান মৃত্যুর মাঝে বয়ে চলা অচ্ছেদ্দ্য জীবন, কৌতুকময় জীবন I

 

 

Article by Subhajeet Singha

Profession- Teaches in a college, Assistant Professor in Dept. of English
E-mail- subhajeet112sigha@gmail.com
Area of Interest- Translation Studies, Renaissance Literature, Postcolonial Studies
Hobby- Travelling, Reading, Photography, Writing, Learning new languages

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Powered by WordPress.com.

Up ↑

%d bloggers like this: