হুব্‌হু সব মেলে না!

লেখা যখন শবদেহের জীবনরেখার মতো এক অসঙ্গত সমান্তরাল উপত্যকায় পাঠককে ঠেলে দেয়, সে লেখার ভূমিকা করা এ সম্পাদকের কম্ম নয়। তবু ভূমিকার নাম দিকনির্দেশ। তাই বলি, এ লেখা পাঠকের চোখে চোখ রেখে ধৃষ্টতা করে, তার মনের ঔদাসীন্যকে উস্কে দেয়, তাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিয়ে যায় খাদের ধারে… কলমে ধার দিয়েছেন সুপ্রিয় মিত্র

দুঃখ একসময় নিয়ম হয়ে দাঁড়ালে, আর কোনও নিয়মকেই কাছে ঘেঁষতে দেয় না। যা কিছু হঠাৎ, ঠিক মনে হয়। যেভাবে মনে হয় দুর্ঘটনাও একটি ঘটনাই। জীবনে যা চাই এবং জীবন যা দেয়, এর মধ্যে বরফ এবং পাথরের মতো কিছু অকাট্য তফাত রয়েছে, যাকে দেখতে দূর থেকে একইরকম লাগে, কিংবা চোখে পড়ে না। দৈনন্দিন খাওয়াদাওয়া ঘুম শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, কাজের মাঝে নানা কাজের আড়ালে তাকে দেখা যায় না, সে তো দেয় না দেখা। ঘুমের ভিতরে নিশ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাভাবিক প্রক্ষালনে সেসব বাস্তবজাত স্বপ্ন যদিও বা স্বচ্ছ হয়ে ওঠে, তা আসলে কুয়াশা। কুয়াশাকে ধুয়ে স্পষ্ট করতে গেলে, কুয়াশা আর কুয়াশা থাকে না। শিশির হয়ে তৃণের শীর্ষে এসে বিঁধে যায়। তাকে কি কুয়াশা দেখা হল– বলা যাবে?

পার্ক স্ট্রিটের গা ঘেঁষেই ফ্রি স্কুল স্ট্রিট। সেখানেই যে আমার প্রথম প্রত্যক্ষ অনুবাদের শিক্ষা গ্রহণ হবে, আমার জানা ছিল না। বাক্যটি কিঞ্চিৎ অবোধ্য ঠেকতে পারে। লিব্রিলিনিয়াতে বই পাঠের যে দিক নিয়ে কাজ হয়, তা, সিদ্ধার্থদা আমাকে এক কথায় বুঝিয়ে দিয়েছিল, সেটাই বলি– ‘বুক রিভিউ’ নয়, ‘রিডার্স এফেক্ট’। পাঠকের ভাবনা মোক্ষণ। কিন্তু সুমন, অর্কপ্রভ, শৌভিক এবং স্বয়ং সিদ্ধার্থদা এত কুলীণ পাঠক, ওদের লেখা পড়ে আমি বরাবর চমকিত হতাম আর নিজের কাছে গুটিয়ে যেতাম। কিছুই পড়িনি, লিখব কী। তার ওপর বিশ্ব সাহিত্যকে জানার যে সুযোগ ২৬টি বর্ণের পারমুটেশন কম্বিনেশনে ইংরেজি ভাষার রয়েছে, তা প্রায় ৫০ বর্ণের হয়েও বাংলা ভাষায় হয়ে উঠতে পারেনি– তার যথেষ্ট স্বাভাবিক ইতিহাস রয়েছে, বিশ্বায়ন রয়েছে, আঞ্চলিকতা রয়েছে, সেসব আপ্ত বাক্য, কিন্তু মোটকথা হল হয়ে উঠতে পারেনি বা পারে না, যতটা সুলভে ইংরেজিতে সম্ভব। আমার মন সবসময় চাইত এই– একটা ইংরেজি বই পড়ে, তা বাংলায় লিখে জানাব, যেখানে সেই বই নিয়ে গল্প থাকবে, যেন সেই গল্পে আরও কয়েক জন ওই বই পড়তে ছুটে যায়, যেন পাঠক না হোক, বাংলা ভাষায় ভাবার লোক একটু হলেও বাড়ে। যেন লাউ ডাল, মুড়ি ঘণ্ট, নিমবেগুন ভাজা দিয়ে ভাত খেয়ে দুপুরের আনমনা সময়ে জিরোতে জিরোতে ওই জিরে ফোড়নের ঢেকুরের মধ্যে দিয়েই সে বাংলা ভাষায় অন্য এক ভাষাকে ছুঁতে পারে।

কিন্তু ভাষা বা লেখাকে পেলেও, তার মন পাওয়া যায় না। মানুষেরই মতন। অপেক্ষায় হাঁটু গেড়ে বসেছিলাম, বসেই ছিলাম। ওই যে বললাম, জীবনের কাছে যা চাই আর জীবন যা দেয়, তার ফারাক বিরোধহীন বিস্তর। গত সপ্তাহে ফ্রি স্কুল স্ট্রিট দিয়ে হঁাটতে হঁাটতে সেই সময় এল শেষমেশ।

সেই ব্রহ্ম মুহূর্তে আমার কাঁধে ছিল এক ঢাউস ব্যাগ, যার চেন কিছুক্ষণ পরেই আমি জানতে পারব খোলা। ব্রাগাঞ্জা থেকে মোটা দুটো গিটার বিষয়ক ম্যাগাজিন, তিন প্যাকেট তার, ফুট স্টুল – এই সমস্ত নিয়ে আমার ব্যাগ বোঝাই। ব্যাগের অধিকাংশ জায়গা এরাই গ্রাস করেছে, তবে এদের ওপরে আছে দুটো বই– একটা ফুটপাত থেকে কেনা পুরনো, আরেকটা ভাইকে উপহার দেব বলে; বই দু’টির পরিচয় কিছুক্ষণ পরেই দিতে চলেছে ফুটপাতে শুয়ে থাকা এক নীল-খয়েরি চোখ। গায়ে কয়েক বছরের পুরনো জামাকাপড়। মাথা, ভুরু, দাড়িগোঁফের চুল সহজাত খয়েরি যা ধুলোয় আরও খয়েরি হয়ে গিয়েছে। ডান কানের উপরাংশ অদ্ভুতভাবে কাটা, এবং তা অনেক দিনের পুরনো, যেন কিছু ঘষে দিয়ে চলে গেছে। শরীরজুড়ে খাদ্যাভাবের প্রদর্শশালা, প্রত্যেকটা হাড়কে চামড়া জড়িয়ে ধরেছে, নয়তো বুঝি অভাবের খাদে সে এই পড়ে যাবে, আর ফিরতে পারবে না। কিন্তু তারপরেও বোঝা যায়, এই চেহারা কোনও বাঙালির এমনকী এ-দেশীয়রও নয়।IMG_20171206_144748-01-01

হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে ঠিক মেনরোডে ওঠার দশ বারো পা আগে ধাক্কা লাগল উলটো দিক থেকে হেঁটে আসা পদচারীর সঙ্গে। খোলা ব্যাগ উপচে রাস্তায় ভেসে পড়ল সেই দুই বই, গিটারের তার এবং ম্যাগাজিন। সবার আগে হাঁটু গেড়ে বসে তারগুলো উদ্ধার করছি, কারণ একবার পায়ে মাড়ালে তার অবস্থা বলার মতো থাকবে না। এমতাবস্থায় পাশ থেকে হাত বাড়িয়ে রেখেছে দুটো বই নিয়ে, দেখি সেই নীল-খয়েরি চোখ।

­–আপনি কি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করতে এভাবে ধাক্কা খেলেন? কেউ বলেছে নিশ্চয় যে এই ‘স্মৃতির রেখা’, ‘গল্পগুচ্ছ’ আর দুটো বই আমিও সেই উন্নিশশো চুরাশি থেকে বয়ে বেড়াচ্ছি।

মানে! বলে কী! আমার কী দায় পড়েছে কোথাকার কে রাস্তার পাগলকে জানবার। আর এমন ফুটপাতবাসী কিনা পড়বে স্মৃতির রেখা, গল্পগুচ্ছ! এই সেই ভাবতে ভাবতে জলদি সব গুছিয়ে এড়িয়ে যাব, এমন সময় হোঁচট খেলাম অন্য জায়গায়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ‘স্মৃতির রেখা’ বইয়ের প্রচ্ছদ প্রায় আবছা। সত্যজিৎ রায়ের করা প্রচ্ছদের কিছু অবশিষ্ট রয়েছে, তাতে সময়ের খামচাখামচি, ক্ষয়ের অলংকরণই আজ বেশি। প্রথম মুদ্রণটিই আমি ফুটপাতে পেয়েছিলাম। সেসবের মাঝে বইয়ের নাম এবং লেখক কিছুই প্রায় বোঝা যাচ্ছে না, একমাত্র যদি না এই বই কারও চেনা হয়ে থাকে। এবং সেখানেই হোঁচট।

কৌতূহল যতটা সম্ভব সামলে আমি তাঁর সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলাম।

–না, না কোনও ঠাট্টা ইয়ার্কি নয় দাদা। আমার সত্যিই কোনও ধারণা নেই আপনার বিষয়আশয় সম্পর্কে, এবং সেই কারণেই অবাক হচ্ছি আপনি চিনলেন কী করে এই বই!

–আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না তাই তো? এই দেখুন। দেখুন।

এই বলে মাথার চাদর ন্যাকড়া সম্বলিত বালিশের পাশে রাখা সেই লোকটির চেয়েও বয়স্ক এক ব্যাগ অতি সাবধানে টেনে বের করলেন। চোখ যাওয়ার পরমুহূর্তে আমার সময় ওখানেই থেমে গিয়েছে। চারদিকে হলুদ-নীল-গোলাপি আলোর টিন্ট। ব্যাগের ভেতর ‘স্মৃতির রেখা’, ‘গল্পগুচ্ছ’, ‘আরণ্যক’ আর হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘বৌদ্ধগান ও দোঁহা’ আর তাদের মাঝে কলকাতার একটা ম্যাপ জিভ বের করে আছে। ক্যালকাটা লেখা। পাশে সাল। ১ স্পষ্ট, ধরে নিচ্ছি ৯ উঠে গেছে, ৮-ও উঠে গেছে, আবার স্পষ্ট হয়েছে ৪।

ভয় হচ্ছিল। ৯-এর জায়গায় তো ৮ হতে পারে। সব কথা কি সত্যি বলে মানুষ?

ভালোনাম তার মনে নেই। ডাকনাম হুব্‌, স্পষ্ট কানে বাজে। কিন্তু তার বাবা যে কী বলেছিল, মনে করতে পারে না। সম্ভবত এই ব্যাগটা নিয়ে আসতে বলেছিল। বাইরে ট্যাক্সি অপেক্ষা  করছে। তিনদিন হোটেলে বন্দি থাকার পর বেরোতে পারার সুযোগ হয়েছিল। বাবা পড়াতো এ-ও মনে আছে, কিন্তু কোথায় কোন দেশে কিচ্ছু মনে নেই। ভাষা হালকা হালকা মনে পড়ে, উচ্চারণও করলেন কিছু বাক্য, কিন্তু তার মানে আর জানা নেই। যেভাবে এক হরবোলা বিভিন্ন ডাক জানে, হাওয়ার আওয়াজ জানে, কোকিলের কুহু দিতে পারে, মেঘের গুড়গুড় গাইতে পারে, কেঁই কেঁই করতে পারে অবিকল কুকুরের আর্তডাক, কিন্তু কোনওটারই অর্থ তার জানা থাকে না, সে হাওয়ার সঙ্গে মেঘের সঙ্গে কোকিলের সঙ্গে কথা বলতে পারে না, প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না, উত্তরের প্রশ্ন করতে পারে না– তেমনই অক্লান্ত বলে যাওয়ার মতো সড়গড় ছিল তার কথা, যা আমিও বুঝলাম না, যে প্রক্ষেপণ আমারও চেনা নয়। সত্যজিতের সিনেমা দেখে মুগ্ধ হয়ে, সম্ভবত আরও জানবে-পড়াশুনো করবে বলে হুব্‌-কে নিয়ে হুব্‌-এর বাবা এসেছিল। তার আগে বাংলা শিখেছিল অনেক দিন। এত বছর এই রাস্তায় থাকতে থাকতে সেসব কথা, সেই না-জানা দেশের বাড়িতে বিকেলে ফেরার পর উচ্চারণ করে বাবার বাংলা অভ্যাস হুব্‌-এর কানে বাজে দূর মন্দিরে ঘণ্টার মতো, কিন্তু বাজে। এত বছরের বহু বহু পোস্টারে তার বিদ্যুৎরেখা যেন পায় হুব্‌। ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে’… ‘দুঃখ বড় সম্পদ, দৈন্য বড় সম্পদ’… জন্ম দিয়েই মরে যাওয়া মাকে তার নিজের এই গত জীবনের সংকেত মনে হয়।

কলকাতায় নামার দু’দিনের মধ্যে দেশজুড়ে চাপা দাঙ্গা লেগে গেল। ইন্দিরা গান্ধী শুট আউট। যে ট্যাক্সিচালক পার্ক স্ট্রিটের হোটেলে নিয়ে এসেছিল, সে শিখ। সে-ই ঘোরাবে কথা হয়েছিল, এ-ও মনে পড়ে, কিংবা এই দীর্ঘ স্মৃতির খেলাধুলোয় এ ঘটনা কল্পনায় মাখামাখি হয়ে আছে। তিনদিন ঘরবন্দি থেকে বাবা শুধু ফোন করে গেল, কারা এসে দেখা করল, গল্প হাসি হল, আর বই উল্টে গেল– এইসব চোখে ভাসে। যেদিন বেরনো, ছোট দুটো ব্যাগ গুছিয়ে বাবা হুব্‌-কে বলেছিল– এই ব্যাগটা নিয়ে তুমি যাও, আমি আসছি। নিচে নেমে ট্যাক্সিতে বসে হুব্‌ তখন পা দোলাচ্ছে। বাবা এসে বসতে, সেই ড্রাইভারও বসল গাড়ির ভিতর। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে একটা গলি পেরোতে না পেরোতেই সামনে থেকে ঠাঁই ঠাঁই ঠাঁই তিনটে গুলি! হুব্‌-এর কান ঘেঁষে একটা গুলি চামড়া ছিঁড়ে বেরিয়ে গেল। ততক্ষণে বাবা আর  ড্রাইভার স্তব্ধ নির্জনতম দুটো দেহ। ট্যাক্সি থেকে বেরিয়ে কোলের ব্যাগ নিয়ে ছুট্‌ ছুট্‌ ছুট্‌। তারপর কোথায় গিয়ে যেন ধাক্কা। আর কিছু মনে নেই। পনেরো দিন পিজিতে ভর্তি। ততদিনে নাকি এই এলাকায় টানা এক সপ্তাহেরও বেশি ১৪৪ ধারা জারি ছিল, ব্যস। এটুকুই বেরিয়েছিল খবরে। কিন্তু কেন, তার কোনও উল্লেখ ছিল না। শুধুই লেখা ছিল– অসন্তোষের কারণে পার্ক স্ট্রিটে ১৪৪ ধারা। তারপর হুব্‌ এভাবেই রাস্তায় রাস্তায়, হোটেলের বাসনেকোসনে সমুদ্র সফেন দিন গুজরান। তরুণ বয়সে তার মুখ আর্ট কলেজের এক ছাত্র এঁকে দিয়েছিল, সে ছবিও দেখলাম। তারপর যা দেখলাম, এই সমস্তটা বিশ্বাস করতে বাকি রইল না। সেই বিখ্যাত বিশপ লেফ্রয় রোডের বৈঠকখানায় সত্যজিৎ রায় এবং তার বাবা, চোখে মুখে আড্ডার হাসি। পোলারয়েড ছবি।

–মানে! এই ছবি দেখিয়ে তো আপনার খোঁজ নিশ্চিত পাওয়া যাবে। এবং যেসময়ের ছবি, তখনও সত্যজিৎ রায় বেঁচে। আপনি একবারও গেলেন না?

–বা আ আ ল, টানা পনেরো দিন হাসপাতালে কাটানোর পর দীর্ঘ ছয় মাস আমার কোনও বোধই ছিল না। শুধুই এখানে–ওখানে কাজ করেছি, দু’-চারটি খেয়েছি আর ঘুমনোর চেষ্টা করেছি। ব্যাগটা খুলতেই ভয় পেতাম। মনে হত যেন খুললেই আমাকে গিলে নেবে। সর্বোপরি, তখন আমার কোনও ভাষা ছিল না!

শেষ বাক্যে যে পরিমাণ শক্তি ক্ষয় করল হুব্‌, তাতে শরীরের চামড়া আরও খানিক সেঁধিয়ে গেল। দীর্ঘ নিশ্চুপ।

–একটু একটু করে বাংলা বলতে শিখেছি। নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার দায়ে। তুমি কি ভাবতে পারছ একটা চার বছরের বাচ্চা যে ভাষা কানে নিয়ে সবে বড় হচ্ছে, ভাবতে শিখছে সেই ভাষায়, তাকে এসে পড়তে হল এমন এক মুলুকে, যেখানে সম্পূর্ণ অন্য ভাষা। শেখা তো দূর, বলা তো দূর, আমি কত কত দিন কী ভাবতে চাইছি, কী ভাবছি, সেটাই বুঝতে পারিনি। নিজের কী ধর্ম নিজেই জানি না, তা আজও আমাকে তাড়া করে। তারপর পড়তে শিখেছি দিনের শেষে ক্লান্ত চোখে;  রাস্তার আলো আমাকে সেই কৌতূহলকে আরও জাগিয়ে দিত। কিন্তু ব্যাগ কিছুতেই খুলতাম না, যেন মনে হত, খুললেই, আমার বেঁচে থাকার সমস্ত ইচ্ছে চলে যাবে। ’৯২ সালের ২৩ এপ্রিল স্পষ্ট মনে আছে। ঠিক ২৪ দিন আগে অস্কার, এও মনে পড়ে। তখন দুর্ভাগ্যক্রমে আমি তিনদিন খেতে না পেয়ে জ্বরের ঘোরে কাতরাচ্ছি এই এইখানেই।  সত্যজিৎ রায় মারা গেলেন, পরের দিন পেপারে পেপারে ছেয়ে গেল। কেন জানি এই প্রথম কোনও মুখ আমার চেনা লাগল। সেই কৌতূহলে রাতে এসে ব্যাগ খুললাম। ততক্ষণে সময়ের স্রোত আমাকে বহু বহু দূরে ঠেলে দিয়েছে। সেবার প্রথম আমি এক বাঙালি হোটেলে কাজ করতে গিয়ে জেনেছিলাম পয়লা বৈশাখের কথা। ‘স্মৃতির রেখা’ পড়তে গিয়ে দেখলাম বিভূতিভূষণ ‘পথের পাঁচালী’ লেখার সময়কালে দিনলিপিতে লিখছেন– হয়তো পাঁচশত বছর পরে যদি আমার লেখা বেঁচে থাকে তবে আমি এই আমি এই অত্যন্ত জীবন্ত প্রত্যক্ষ আমি, অনেক প্রাচীনকালের এক লেখক হয়ে যাব… আমি তো দেখতে আসতে পারব না, কিন্তু আমার লেখা এই দুঃখ, সিনসিয়ার দুঃখ পড়ে তখনকার তরুণ লেখক-পাঠক ভরসা পাবে, বাঁচতে শিখবে। কী হে ঠিক বলছি?

–একদম।

–নিজেকেও এরকমই লাগে। তোমাদের ভাষা শিখে আমি বেঁচে আছি, কিন্তু যে ভাষা মায়ের পেট থেকে শুনে এলাম, তা আমি হারিয়ে ফেললাম, এই দুঃখ আমার কিছুতেই যায় না। সেই ভাষা যেন মাঝেমাঝেই খাবি খায় আমার ভাবনার মধ্যে, আর বাংলা ভাষায় ভাবতে গিয়ে মাঝেমাঝেই হোঁচট খাই। তারপরেও এই ভাষা আমাকে মায়ের মতোই বাঁচিয়ে রেখেছে। আমার আর কিছুই দরকার নেই। আমার বেঁচে থাকা আমার হাতে ছিল না, আজও নেই। মৃত্যুর সঙ্গেও তাই আমার লড়াইয়ের কিছু নেই। শুধু তোমাদের ভাষার টানে আমার বাবা এসেছিল, সেই নিয়তি আমাকে এখানে এনেছে। ভাবি, মা তো আমার মারা গেছিল। এই ভাষার প্রেমে বাবা পড়েছিল যখন সে বাবার প্রেমিকা, খানিক হলেও, সৎ হলেও সে আমার মা। পূর্ব কোনও পরিচয়ের টানই আমার নেই। বাংলা দিবস জানি, আজকাল তো তোমরা সেসব মনে রাখতে পারো না। শুধু ইংরেজি তারিখ জানো। তোমরা এই পয়লা বৈশাখ কি আদৌ টের পাও? এই সময়ে বিভূতিভূষণ মেঘ, সত্যজিৎ বায়ু তোমরা বুঝতে পারো? পয়লা বৈশাখ তো এসে গেল। বছরের শুরু কীভাবে করবে ভেবেছ?

–না তেমন কিছু ভাবিনি। কিন্তু আপনার কথা যদি লিখি?

–লেখো। যা ইচ্ছে করো। মুখের বিবরণ দিও না। আমাকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হোক মানুষ আমি চাই না। আর ক’টা দিন তো আছি। তুমি জানলে এই অনেক, দু’জনের একই বই আমাদের এভাবে সাক্ষাৎ করালো। জীবন শোনা হল। এও কি কম? ওই দূরে দেখছ বড় অশ্বত্থ গাছটা?

–হ্যাঁ।

–এও নিশ্চয় দেখেছ, পুরনো বাড়ির মাথায় মাথায় দেয়ালে দেয়ালে অশ্বত্থ গাছ জন্মায়। রাস্তায় বড় অশ্বত্থ গাছ দেখলেই আমার খালি মনে হয় যেন, তলায় কোনও বাড়ি চাপা পড়ে আছে। বাড়ির ছাদটুকু একচিলতে জেগে আছে গাছের গুঁড়ির তলায়। কিন্তু যদি সেই বাড়ি আমি খুঁজতে যাই, গাছটাকে আগে সরাতে হবে, খুঁড়তে হবে, কাটতে তো হবেই। নিজের কৌতূহলকে প্রশ্রয় দিয়ে ওই বৃদ্ধ গাছ আর চাপা পড়ে যাওয়া বাড়ির দীর্ঘ সম্পর্ককে সরানোর কোনও দুঃসাহস আমার নেই। হাওয়া লাগলে পাতায় পাতায় যে শিরশিরানি লাগে, আমি ভাবি সেই হাওয়া তলার জানলাগুলোয় পৌঁছচ্ছে নিশ্চিত। তুমি আমার জীবন থেকে এই নিশ্চিন্তি কেড়ে নিও না। তোমার গল্প শোনাতে এসো একদিন।IMG_20171127_135108-01-01

 

 

বিঃ দ্রঃ– ‘রোজ কত কী ঘটে যাহা তাহা, এমন কেন সত্যি হয় না আহা’

ছবি সৌজন্যে: দীপিকা গিরি

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Powered by WordPress.com.

Up ↑

%d bloggers like this: